বন্ধক bomdhok
শোভন তখন সোহিনীর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কাঠের চিতেটা ধীরে ধীরে জ্বলছে ঠিকই, কিন্তু আগুনের চেয়ে বহুগুণ বেশি দাউদাউ করে পুড়ে যাচ্ছে যেন শোভনের ভেতরটা। বাইরে তার মুখে কোনো ভাঙনের চিহ্ন নেই—না কান্না, না চিৎকার, না কোনো অভিযোগ। অথচ মাত্র দু’বছরের বিবাহিত জীবনের প্রতিটি স্মৃতি যেন একে একে ছাই হয়ে উড়ে যাচ্ছে তার চোখের সামনে। এমন কিছু শোক থাকে, যা চোখের জল হয়ে বেরোয় না; বুকের গভীরে জমাট বেঁধে মানুষটাকেই নীরবে ভস্ম করে দেয়।
আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিলাম। আগস্টের দুপুরের গরমের একটা আলাদা স্বভাব আছে। রোদের তীব্রতা ততটা নয়, তবু বাতাসের মধ্যে একটা দমবন্ধ করা জ্বালা লেগে থাকে। বর্ষার আর্দ্রতা চারপাশকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরে যে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। জামাকাপড় শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে, কপাল বেয়ে অবিরাম ঘাম গড়িয়ে পড়ছে সবার। অথচ সেই অস্বস্তিকর গরমের মাঝেও শ্মশানের বাতাসে একটা অদ্ভুত শীতলতা—যেন মৃত্যু নিজের উপস্থিতি দিয়ে সমস্ত উষ্ণতাকে নিঃশব্দে গ্রাস করে নিয়েছে।
অরিত্র আমার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।
আমি পকেট থেকে একটা ক্লাসিক রেগুলার বের করলাম। কিছুক্ষণ আঙুলের ফাঁকে ঘুরিয়ে অরিত্রর দিকে আরেকটা বাড়িয়ে দিলাম।
অরিত্র সামাজিক ধূমপায়ী। মাঝেমধ্যে, আড্ডার ফাঁকে কিংবা বিশেষ কোনো মুহূর্তে একটা-দুটো খায়। ও আমার হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে নিঃশব্দে রাখল। এই মুহূর্তে ধোঁয়ার চেয়েও ভারী ছিল চারপাশের নীরবতা।
চিতার আগুনে মাঝে মাঝে শুকনো কাঠ ফেটে ওঠার শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না।
আমি কিছুক্ষণ আগুনটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর ধীরে, প্রায় নিজের সঙ্গেই কথা বলার মতো স্বরে বললাম,
— “জানিস, অরি… ভাবছিলাম সোহিনীকে হারানোর পর একটা বিরাট শূন্যতা অনুভব করব। অথচ অদ্ভুতভাবে… তেমন কিছুই হচ্ছে না।”
কথাটা বলেই থেমে গেলাম। নিজের মুখে উচ্চারিত বাক্যটাই যেন নিজের কাছেই অপরিচিত লাগছিল। কখনও কখনও মানুষের শোক কান্না হয়ে আসে না; অনুভূতিগুলো এতটাই অবশ হয়ে যায় যে শূন্যতারও কোনো রূপ খুঁজে পাওয়া যায় না।
অরিত্র অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে বলল,
— “নীর ওর মায়া তো তুই অনেক আগেই ত্যাগ করেছিলি , এখন আবার এসব বলার কি দরকার?”
কথাটা বলেই ও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। যেন উত্তরটা ওর জানা, তবু আমার মুখ থেকেই শুনতে চায়।
— “দরকার হবে না কেন? যে ক’টা দিন মায়া ছিল, সে ক’টা দিন তো ওকে মায়াবী ভেবেই বুকের ভেতর আগলে রেখেছিলাম। সেই অনুভূতিগুলো কি মিথ্যে ছিল?”
একটু থেমে চিতার আগুনের দিকে তাকালাম। শিখাগুলো কাঠকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে….
— “মেয়েটার স্বভাবে খুঁত ছিল—সেটা পিসিমা যে আমাকে বলেনি, এমন নয়। বরং বারবার সাবধান করেছিল। কিন্তু মানুষ যখন কারও প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সতর্কবাণীগুলো যুক্তি হিসেবে শোনা যায়, সত্যি হিসেবে নয়। আমি জানতাম… তবু বিশ্বাস করতে চাইনি।”
অরিত্র শেষবারের মতো সিগারেটটায় টান দিয়ে ছাই ঝেড়ে ফেলল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
— “যেদিন সোহিনী প্রথম আমার কাছে এসেছিল, সেদিনই বুঝেছিলাম ও একটা সদ্য-সেরে-ওঠা ট্রমা বয়ে বেড়াচ্ছে। বাইরে থেকে নিজেকে খুব স্বাভাবিক দেখাত, কিন্তু ভেতরটা তখনও ভাঙা ছিল। সেই সময় ওর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল নিঃশর্ত ভালোবাসা—এমন একটা আশ্রয়, যেখানে নিজেকে আর লড়তে হবে না।”
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ওর দিকে তাকালাম।
— “তারপর? তুই কী করলি, অরি?”
অরিত্র উত্তর দেওয়ার আগে ধীরে ধীরে চশমাটা খুলে জামার কোণ দিয়ে কাচ মুছল। যেন স্মৃতির ওপর জমে থাকা কুয়াশাটাও একই সঙ্গে সরিয়ে ফেলতে চাইছে।
মৃদু হেসে বলল,
— “তোর মনে আছে? এক বর্ষার সন্ধ্যায় আমরা তিনজন—আমি, তুই আর শোভন—ছাদে বসেছিলাম।”
একটু থেমে আমার দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
— “তোরা বললে ভুল হবে। তুই তখন মেয়েবাজিতে পাগল হয়ে বেড়াচ্ছিলি। প্রেমকে খেলার মতো নিতিস, আর আমরা বসে বসে তোর গল্প শুনতাম।”
আমি মাথা নিচু করলাম। প্রতিবাদ করার মতো কিছু ছিল না।
অরিত্র আবার বলতে শুরু করল,
— “সেদিন তুই আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলি, ‘কেমন মেয়ে চাই তোর? আমি তখন ছ’টাকার একটা সিগারেট টানতে টানতে বলেছিলাম, একটা একেবারে নিষ্পাপ মেয়ে চাই। যার সঙ্গে প্রেম করব। কোনো বড় স্বপ্ন না, কোনো নাটকীয়তা না। সন্ধেবেলা বাইকে করে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াব। রাস্তার ধারের দোকানে বসে এক প্লেট মোমো ভাগাভাগি করে খাব। আর বর্ষার দিনে, ওর সম্মতি নিয়ে, একটা ছাতার নিচে পাশাপাশি হাঁটব—কোনো গন্তব্য ছাড়া। শুধু হাঁটব। মনে হবে, পৃথিবীটা খুব বড় নয়; ওই এক চিলতে ছাতার নিচেই আমার সমস্ত জীবন আটকে আছে।”
অরিত্র যেন আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। ঠোঁট দুটো নড়েও উঠেছিল। কিন্তু হঠাৎই আমাদের দৃষ্টি চলে গেল শোভনের দিকে।
এতক্ষণ পর্যন্ত যে মানুষটা পাথরের মতো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিল, সে আচমকাই ভেঙে পড়ল। হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ে দু’হাতে মুখ ঢেকে হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করল। সেই কান্নায় কোনো সংযম ছিল না, কোনো লজ্জা ছিল না—শুধু ছিল এক মানুষকে হারিয়ে ফেলার অসহায় স্বীকারোক্তি।
আমি আর অরিত্র দ্রুত ওর কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওর কাঁধে হাত রাখলাম। কেউ সান্ত্বনার ভাষা খুঁজে পেলাম না। এমন কিছু শোক থাকে, যেখানে ভাষা কেবলই অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। আমি বোতল থেকে জল এগিয়ে দিলাম। শোভন কাঁপতে কাঁপতে কয়েক চুমুক খেল। অনেকক্ষণ পরে ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিল সে।
ওকে একা থাকতে দিয়ে আমরা আবার সেই গাছটার নিচে ফিরে এলাম।
আমি পকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বের করলাম। প্যাকেটে আর বেশি নেই। যেটুকু আছে, অরিত্র আর আমাকে ভাগ করেই শেষ করতে হবে।
আগুন ধরিয়ে প্রথম টানটা নিয়ে আমি বললাম,
— “অরিত্র, তোরা তখন আমাকে মেয়েবাজ ভাবতিস। আমি যে ছিলাম না, সেটা বলছি না। ছিলাম। কিন্তু ওই সময়টা আমি যতটা উপভোগ করেছি, তার চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট পেয়েছি… আর অনেক বেশি কষ্ট দিয়েছি।”
অরিত্র ভ্রু তুলে তাকাল।
— “কষ্ট পেয়েছিস, না দিয়েছিস?”
আমি হেসে ফেললাম।
— “ধন্যবাদ, সংশোধন করার জন্য। দুটোই।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম,
— “সোহিনীকে আমার ভালো লাগত এম.এসসি.-র টিউশন থেকেই। ও আমাদের বাড়ির পাশেই থাকত। বাড়ির সবাই ওকে চিনত। ছোটবেলায় একসঙ্গে খেলাধুলোও করেছি। তারপর জীবন নিজের মতো করে সবাইকে আলাদা পথে নিয়ে গেল। বহু বছর তেমন কোনো যোগাযোগই ছিল না।”
দূরে চিতার আগুন জ্বলছে।
— “কোচিংয়ে আবার দেখা হওয়ার পর ধীরে ধীরে কথাবার্তা শুরু হল। পুরোনো পরিচয়টা নতুন করে ফিরে এল। প্রথমে শুধু খোঁজখবর, তারপর একসঙ্গে বাড়ি ফেরা, মাঝেমধ্যে ছোট ছোট গল্প… অজান্তেই দূরত্বটা কমতে লাগল।”
অরিত্র আমার হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে একটা টান দিল। ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে আকাশে ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ শুনতে থাকল।
— “কোচিং থেকে আমরা একসাথে বাড়ি ফিরতাম। সেই পথটা ছিল ছোট, কিন্তু ওই কয়েক মিনিটের মধ্যেই সোহিনী….. মাঝে মাঝে আমার হাতটা ধরে বসত। আঙুলগুলো শক্ত করে জড়িয়ে রাখত, যেন ভয় পাচ্ছে হারিয়ে যাবে। একটু একটু করে আমরা এগোচ্ছিলাম। সোহিনীকে যে আমার খুব পছন্দ ছিল, এমনটা নয়। তখন তো মনটা ছিল একদম এলোমেলো।”
একটু থেমে গেলাম। মিতার নামটা উচ্চারণ করতে এখনো বুকের ভেতরটা হালকা করে কেঁপে উঠল।
— “মিতার সাথে তখন এত জটিলতা চলছিল… সেই ঝামেলার পর মনটা বারবার সোহিনীর দিকেই আটকে যাচ্ছিল। ওর মধ্যে একটা মাতৃসুলভ ব্যাপার ছিল। খুব প্যাম্পার করত। সবসময় দেখে রাখত—আমি খেয়েছি কি না, ঠান্ডা লেগেছে কি না, ক্লাসের নোট ঠিকমতো নিয়েছি কি না। চোখ দুটোয় একটা নজরদারি ছিল, যেটা আরাম দিত। অথচ সেই আরামের ভেতরে নিয়ন্ত্রণ।”
আমি হালকা করে হাসলাম। তিক্ত, ক্লান্ত একটা হাসি।
— “কোচিংয়ের পেছনের চিলেকোঠায় একদিন বেশ শীতের সময়। আমি লুকিয়ে সিগারেট খাচ্ছিলাম। ধোঁয়াটা লুকোনোর চেষ্টা করছি, এমন সময় সোহিনী এসে হাজির। চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখল কিছুক্ষণ। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, ‘আমাকেও একটা দে। আমিও ট্রাই করব।’”
কথাটা বলে আমি চিতার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সেই মুহূর্তটা আজও মনে পড়লে বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ভারী হয়ে যায়।
“থেমে যাস ক্যান? বলতে থাক।”
অরিত্রের দিকে তাকিয়ে আমি আবার শুরু করলাম।
— “সিগারেটটা ঠোঁটে দিতেই সোহিনী কাশতে আরম্ভ করল। প্রথম টানেই চোখ দুটো লাল হয়ে উঠল, মুখটা বিকৃত। আমি হাসছিলাম, ওর সেই অসহায় চেহারাটা দেখে বুকের ভেতরটায় কাতুকুতু লাগছিল। ঠিক সেই সময় স্যার বুঝতে পেরে গেছেন। উঠে এসে যখন দেখলেন, তখন সোহিনীর বেশ মান-সম্মানে লাগল। ওর চোখে জল চলে এসেছিল।”
আমি একটু থেমে নিঃশ্বাস নিলাম। সেই দিনের ঠান্ডা বাতাসটা আজও গায়ে লেগে আছে।
— “আমি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু সোহিনীর কাশি আর কোনো কিছুই লুকিয়ে রাখতে পারল না। স্যারের রুমে গিয়ে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলাম। স্যার আমাকে প্রচুর কথা শুনিয়ে ছেড়ে দিলেন। বেরিয়ে আসার সময় মনটা খারাপ ছিল। অপরাধবোধ, রাগ, আর একটা অদ্ভুত অস্বস্তি—সব মিলেমিশে।”
রাস্তার কথা মনে পড়তেই গলাটা আরও নরম হয়ে গেল।
— “সোহিনীকে বাড়ির কাছে নামিয়ে দেওয়ার সময় ও হঠাৎ আমায় জড়িয়ে ধরল। গলাটা কাঁপছিল। বলল, ‘ফার্স্ট টাইম কেউ এরকম করল আমার জন্য।’ আমি কিছু বললাম না। শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। আর তারপর… সোহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার ঠোঁটে চুমু খেল। রাস্তার ঠিক মাঝখানে।”
সেই মুহূর্তের অস্বস্তি আর ভালো লাগাটা একসাথে মনে পড়ল।
— “ঘটনার আকস্মিকতায় আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। ঠোঁট দিয়ে ওকে ঠিক অনুভব করতেই পারলাম না। কিন্তু খুব ভালো লেগেছিল। সেই প্রথমবার ওর ঠোঁটের স্পর্শে মনে হয়েছিল, হয়তো এই নিয়ন্ত্রণ, এই যত্ন, এই আকস্মিক আবেগ—সবকিছুর মাঝে একটা আশ্রয় লুকিয়ে আছে।”
আমি চুপ করে গেলাম। অরিত্রও কিছু বলল না…. চুপ এইজন্যে করিনি যে গল্প আমাদের শেষ। থেমে গেলাম কারণ এরপরের ঘটনাগুলোকে তো রুচি সম্মত কেউই শ্মশান ঘাটে বসে বলবে না!
অরিত্র মাথাটা পেছনে গাছে ঠেকা দিয়ে চোখ বুজল। আমিও চোখ বুজে মনে করতে লাগলাম তারপরের ঘটনাগুলো।
স্মৃতিটা যেন ঢেউয়ের মতো উঠে আসছিল, বুকের ভেতরটা দমচাপা করে।
সেই বিকেল… বৃষ্টি আর ছাদের ঘরটা,
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল অবিরাম। ছাদের পুরোনো টিনের চালে জলের শব্দ যেন একটা উন্মাদনার তাল তুলছিল। ঘরের ভেতরটা অন্ধকারাচ্ছন্ন, শুধু একটা ফাটা জানলা দিয়ে হালকা আলো এসে পড়ছিল সোহিনীর মুখে। ওর চুল ভিজে গিয়েছিল কিছুটা, কয়েকটা চুল লেপটে ছিল গালে। চোখ দুটোয় সেই চেনা নিয়ন্ত্রণের আবেগ, আর তার নিচে লুকিয়ে থাকা একটা ভয়ংকর নির্ভরতা যেটা ক্ষীন আলোতেও স্পষ্ট…..
ও আমার কাছে এগিয়ে এল ধীর হয়ে। প্রতি পদক্ষেপে ওর শাড়ির আঁচলটা সামান্য সরে যাচ্ছিল, উন্মুক্ত করে দিচ্ছিল কাঁধের নরম ত্বক। “নীর… আজকেও দূরে থাকবি?”
হাতটা বাড়িয়ে আমার জামার বোতামে লাগাল। একটা একটা করে খুলতে খুলতে ওর আঙুলগুলো আমার বুকে ছোঁয়া দিচ্ছিল—ঠান্ডা বৃষ্টির হাওয়ার সঙ্গে গরম হয়ে উঠছিল সেই স্পর্শ। আমার হৃদস্পন্দন তখন এত জোরে চলছিল যে মনে হচ্ছিল ও নিশ্চয়ই শুনতে পাচ্ছে।
আমি ওর কোমরটা জড়িয়ে ধরলাম। শরীর দুটো ক্রমশ কাছাকাছি হয়ে আসছিল। ওর বুক আমার বুকে চেপে বসছিল, নরম তুলতুলে সেই স্তনের ছোঁয়া….। ওর শ্বাস আমার ঘাড়ে পড়ছিল গরম, ভেজা। সোহিনী মুখ তুলে আমার চোখে চোখ রাখল। সেই দৃষ্টিতে ছিল অধিকার, ছিল ভিক্ষা, ছিল একটা অসহ্য ক্ষুধা। “তুই আমার। শুধু আমার,”
“আমি কেবলই তোর..!”
ফিসফিস করে বলে ও আমার ঠোঁট কামড়ে ধরল। কামড়টা হালকা নয়—যন্ত্রণা আর আনন্দের মাঝামাঝি। আমার হাত অজান্তেই ওর পিঠ বেয়ে নেমে গেল, আঁচলটা সরিয়ে দিল। ত্বকের স্পর্শে বিদ্যুৎ খেলে গেল শরীরে।
ও আমাকে ঠেলে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরল। পিঠে ঠান্ডা দেয়াল, সামনে ওর উত্তপ্ত শরীর—দুইয়ের মাঝে আমি আটকে পড়লাম। ওর হাত আমার চুলের মধ্যে ঢুকে গেল, জোর করে মাথাটা পেছনে হেলিয়ে দিল। ঠোঁট থেকে ঘাড়, ঘাড় থেকে কলারবোন—ওর মুখ নেমে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে, চুমু, কামড়, জিভের স্পর্শ। প্রতিটা ছোঁয়ায় যেন আমার শরীরের প্রতিটা কোষ জেগে উঠছিল। আমার হাত ওর কোমর চেপে ধরছিল আরও শক্ত করে, নখ বসে যাচ্ছিল মাংসে। ও একটা ছোট্ট কঁপা শব্দ করল—যন্ত্রণা নয়, আনন্দের।
বৃষ্টির শব্দ বেড়ে উঠছিল। ঘরের ভেতরটা ভিজে যাচ্ছিল ফোঁটায় ফোঁটায় সাথে সোহিনীর শাড়ির কুঁচি খুলে যাচ্ছিল অল্প অল্প করে। ওর ত্বকের উষ্ণতা, ঘাম আর বৃষ্টির মিশ্রণ—সব মিলে একটা নেশা তৈরি করছিল। ও আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে কাঁপা গলায় বলল, “আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না। এর থেকে বেশি আত্মসংযম আমার নেই রে।” ওর আঙুল আমার প্যান্টের বেল্টে গিয়ে আটকে গেল, টানতে টানতে খুলতে শুরু করল।
আমার তখন অপরাধবোধ, লোভ, ভালোবাসা, নিয়ন্ত্রণের ভয়। কিন্তু সেই মুহূর্তে কিছুই আর গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। শুধু ওর শরীরের কাছে আত্মসমর্পণ করার একটা অসহ্য টান। আমরা দুজনেই তখন শ্বাসকষ্টে ভুগছিলাম, শরীর দুটো একে অপরকে চাইছিল প্রাণপণে, কিন্তু এখনো শেষ সীমারেখা অবধি পৌঁছে যায় নি….
সোহিনীর আঙুলগুলো আমার বেল্টটা খুলে ফেলল এক টানে। প্যান্টের চেন নামিয়ে দিতেই ঠান্ডা বাতাসে আমার শরীরের নিচের অংশটা শিউরে উঠল। ও পিছিয়ে এক পা গিয়ে আমার দিকে তাকাল। চোখ দুটোয় ক্ষুধা আর অধিকারের আগুন জ্বলছিল। “আমাকে দেখ,” বলে নিজের আঁচলটা পুরোপুরি সরিয়ে দিল। শাড়ির কুঁচি খুলে গেল, ব্লাউজের হুকগুলো একে একে খুলতে খুলতে ও আমার সামনে দাঁড়াল। ওর নরম, ভারী দুদু দুটো উঠানামা করছিল দ্রুত শ্বাসে। কোমরের বাঁক, নাভির গভীরতা, আর নিচের ভেজা গোপন অংশটা…. সবকিছু বৃষ্টির আলোয় চকচক করছিল।
আমি ওকে জড়িয়ে ধরে ঠেলে নিয়ে গেলাম পুরোনো চৌকির দিকে। বিছানায় পড়তেই ও আমার উপর উঠে এল। ওর ঠোঁট আমার ঠোঁট চেপে ধরল গভীর চুমুতে। জিভ দুটো জড়াজড়ি করছিল, লালা মিশে যাচ্ছিল, শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল দুজনেরই। ওর নখ আমার বুকে আঁচড় কাটছিল, রক্তের হালকা স্বাদ পাচ্ছিলাম ঠোঁটে। “শক্ত করে ধরে….,” ও ফিসফিস করে বলল। আমার হাত ওর বুকে চেপে ধরল, আঙুল নিপলগুলো চেপে টেনে দিল। সোহিনী একটা আর্তনাদ করে উঠল—যন্ত্রণা আর আনন্দ মেশানো খানিকটা যেন অমানবিক…. ওর শরীরটা আমার উপর রেখে ঘষতে শুরু করল, নিচের ভেজা ভগাঙ্কুর আমার শক্ত লিঙ্গের উপর চেপে ঘষছিল।
আমি ওকে উলটে দিলাম। এবার আমি উপরে। ওর পা দুটো ফাঁক করে নিজের কোমরের দুপাশে রাখলাম। আঙুল দিয়ে ওর ভেজা যোনিতে ছুঁয়ে দেখলাম—একদম ভিজে সপসপ করছিল। দুটো আঙুল ঢুকিয়ে দিতেই সোহিনী কেঁপে উঠল, “আহh… নীর… একটু আস্তে তোর হাতে নখ আছে…” আমি তাই সাবধানে আঙুলগুলো নড়াতে লাগলাম, ভেতরের নরম দেওয়ালগুলো চেপে ধরছিল। ওর শরীরটা খিলখিল করে কাঁপছিল। স্তন দুটো উঠানামা করছিল। আমি মুখ নামিয়ে একটা নিপল মুখে নিয়ে চুষতে শুরু করলাম—জোরে, কামড় দিয়ে। ওর হাত আমার চুল খামচে ধরল, টেনে আরও কাছে নিয়ে গেল।
আমি আমার শক্ত, গরম লিঙ্গটা ওর যোনির মুখে ঘষলাম কয়েকবার। সোহিনী চোখ বন্ধ করে কাঁপা গলায় বলল, “ভেতরে ঢোকা… এখনই। আমাকে তোর করে নে। তোর সন্তানের মা বানিয়ে দে আমায়!” এক ঠেলায় আমি আস্তে আস্তে ওর ঠোঁটগুলো চেপে ধরে বাড়া পুরোটা ঢুকিয়ে দিলাম। ওর ভেতরটা গরম, আঁটোসাঁটো, ভেজা—যেন আমাকে গিলে নিতে চায়। সোহিনী চিৎকার করে উঠল, নখ আমার পিঠে বসিয়ে দিল। রক্তের দাগ পড়ল। আমি ধীরে ধীরে নড়তে শুরু করলাম। প্রতি ঠেলায় ওর শরীর কেঁপে উঠছিল। “জোরে… আরও জোরে রে… ভাঙ আমাকে,” ও চেঁচিয়ে বলল।
আমার গতি বাড়ল। ঘন ঘন ধাক্কা দিতে লাগলাম। ওর যোনির ভেতরটা আমার লিঙ্গকে চেপে ধরছিল প্রতিবার। শব্দ হচ্ছিল—চপচপ, শরীরের চাপড়ানোর আওয়াজ, আর ওর আর্তনাদ। বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল সব। আমি ওর পা দুটো কাঁধের উপর তুলে আরও গভীরে ঢুকতে লাগলাম। প্রতি ধাক্কায় ওর সুডোল দুধজোড়া লাফাচ্ছিল। আমি এক হাতে ওর গলা চেপে ধরলাম হালকা করে—নিয়ন্ত্রণের খেলা দেখেছিলাম। সোহিনীর চোখে জল চলে এসেছিল আনন্দে। “হ্যাঁ… এভাবেই… তোর বেশ্যার মতো চোদ আমায়,” ও হাঁপাতে হাঁপাতে বলছিল।
কথাটা শুনে কেমন একটা লাগলো। তুমি করছ সেক্স! ওখানে নিজেকে এত ডিগ্র্যাড করার কি দরকার। তুমি শিক্ষিত বাড়ির মেয়েছেলে হয়ে পরের বাড়ির ছেলের জন্যে বেশ্যা হবে?
আমরা অবস্থান বদলালাম। ওকে হাঁটু মুড়ে ডগী মতো করে বসিয়ে পেছন থেকে ওর শরীরে আবার প্রবেশ করলাম। ওর কোমর চেপে ধরে জোরে জোরে ঠেলছিলাম নিজের কামোত্তেজনা তে। ওর পাছা আমার উরুতে আছড়ে পড়ছিল প্রতিবার। হাত বাড়িয়ে ওর বুক মালিশ করছিলাম, নিপল গুলো আঙ্গুল দিয়ে খেলছিলাম…। সোহিনী মাথা পেছনে হেলিয়ে কাঁদছিল প্রায়, “আরও… চোদ… আহহহ” ঘামে আমাদের শরীর পিচ্ছিল হয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টির জল ছাদ থেকে পড়ছিল আমাদের গায়ে, ঠান্ডা আর গরমের মিশ্রণে উন্মাদ করে দিচ্ছিল।
আমি ওকে আবার চিত করে শুইয়ে দিলাম। পা দুটো ফাঁক করে এবার খুব ধীরে ধীরে ঢুকলাম, তারপর হঠাৎ জোরে। এই খেলাটা ওকে পাগল করে দিচ্ছিল। ওর যোনি থেকে রস গড়িয়ে পড়ছিল চৌকিতে। আমার লিঙ্গটা ভেতরে নড়াচ্ছিলাম বারংবার, ওর সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গাগুলো ছুঁয়ে। সোহিনী শরীরটা তোলপাড় করছিল।
আঙুলের নখ দিয়ে ওর বোঁটা গুলোতে আস্তে আস্তে দাগ কাটছিলাম। সারা শরীর জুড়ে ওর শিহরণ জাগাতে আমি মারাত্মক স্বক্ষম হচ্ছিলাম।
“i am coming নীর…. ,” ও চেঁচিয়ে বলল। আমার গতি আরও বাড়ল। শরীর দুটো একসাথে কাঁপছিল। শেষ কয়েকটা তীব্র ধাক্কায় ওর যোনির ভেতরটা সংকুচিত হয়ে আমাকে চেপে ধরল। সোহিনী একটা লম্বা আর্তনাদ “আহহহহহ……..”করে অর্গাজমে ভেঙে পড়ল। শরীরটা থরথর করে কাঁপছিল। আমিও আর ধরে রাখতে পারলাম না। গভীরে ঢুকিয়ে দিয়ে ঢেলে দিলাম সব। গরম বীর্য ওর ভেতরে ভরে গেল।
দুজনেই হাঁপাতে হাঁপাতে জড়াজড়ি করে পড়ে রইলাম। ঘাম, বৃষ্টির জল, আর শরীরের তরল মিশে একাকার। সোহিনী আমার বুকে মুখ গুঁজে কাঁপছিল। “তুই আমার হবি তো?… চিরকাল,” ও ফিসফিস করে বলল। সেই মুহূর্তে আমার ভেতরে সেই আদিম অস্বস্তিটা এলো—এই তীব্রতার পরেও কোথায় যেন একটা ফাঁকা অংশ! Commitment? আমি? একলাইনে কীভাবে আসবে?!
___________
অরিত্র চোখ খুলে হঠাৎই নীরবতা ভেঙে বলল,
— “তোরা একে অপরের খুব কাছাকাছি ছিলি। নিয়মিত সেক্স করতিস। প্রচুর ট্যুর করতিস। তোর পিসিমা জানত তোদের ব্যাপারে। দু’জনেই দু’জনকে নিয়ে ভীষণ অবসেসড ছিলি। সমস্যাটা সেটা ছিল না, নীর। সমস্যাটা শুরু হল সেদিন, যেদিন প্রায় ১৪ মাস পর তুই হঠাৎ ওকে বলে দিলি—এই সম্পর্কটা আর তোর পক্ষে টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।”
ও একটু থামল।
— “এখনকার দিনে মানুষ ‘ডিটাচমেন্ট ইস্যু’ কথাটা জানে। বোঝে যে, কেউ কেউ ভালোবেসেও হঠাৎ নিজেকে গুটিয়ে নেয়। কিন্তু তখন? তখন এসব কেউ বুঝত না। তাই তোর সিদ্ধান্তটা মেনে নেওয়া সোহিনীর পক্ষে অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল।”
আমি চুপ করে শুনছিলাম। অরিত্রর প্রতিটা কথাই যেন বহুদিন আগের কোনো বন্ধ দরজায় ধাক্কা মারছিল।
ও আবার বলতে শুরু করল,
— “সেপ্টেম্বরে ১৮-২০ ওরকম হবে, একদিন কলেজ মোড়ে দেখি, সোহিনী একা বসে কাঁদছে। চারপাশে লোকজন যাচ্ছে-আসছে, অথচ ওর যেন সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। আমি গিয়ে পাশে বসলাম। অনেকক্ষণ কিছু বলিনি। তারপর শুধু জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে?’ ”
অরিত্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “তখন তো গোটা কলেজ, ইউনিয়ন, কোচিং সবাই জানত, ও তোর প্রেমিকা। তাই ওকে ওই অবস্থায় দেখে আমার কেনো জানি না মনে হলো, ঘটনাটা তোকে নিয়েই।”
আমি নিঃশব্দে অরিত্রর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
— “সেদিন অনেকক্ষণ ওকে বোঝালাম। মানুষ যখন ভেঙে পড়ে, তখন উপদেশ নয়, পাশে বসে থাকাটাই বেশি দরকার হয়। তারপর রাস্তার ধারের দোকানে পাশাপাশি বসে এক কাপ করে চা খেলাম। চা শেষ হওয়ার পর আমি বলেছিলাম, ‘চল, তোকে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিই।’
ও ‘না’ বলেনি।
ওই একসঙ্গে হাঁটাটুকুই হয়তো সবকিছুর শুরু ছিল।
তারপরও সোহিনীর সঙ্গে মাঝেমধ্যেই দেখা হতো। প্রথমে কেবল খোঁজখবর, তারপর ছোট ছোট কথা। অদ্ভুতভাবে কথাগুলো প্রতিদিনের অভ্যাস হয়ে উঠল। এমন একটা সময় এল, যে ওর দুটো মেসেজ না এলে দিনটা অসম্পূর্ণ মনে হতো। আমার ধারণা, ওরও হয়তো ঠিক একই রকম লাগত।
— “তোর কথা উঠলেই ও ভেঙে পড়ত। প্রায় রোজই। তোর সঙ্গে সম্পর্কটা কোথায় গিয়ে আটকে গেল, কেন তুই দূরে সরে গেলি—এই প্রশ্নগুলোই ওকে কুরে কুরে খেত। তোর অবহেলা, তোর নীরবতা, তোর হঠাৎ বদলে যাওয়া… সবকিছু মিলিয়ে মেয়েটা ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড কষ্টে ছিল।”
ও এবার আমার দিকে তাকাল।
— “তবে একটা কথা আমি কখনোই বলব না যে সব দোষ তোর ছিল। সম্পর্ক ভাঙলে দোষ খুব কমই একপক্ষের হয়। তুইও তখন নিজের যুদ্ধ লড়ছিলি।”
আমি নির্বাক…. আমার সম্পর্ক নিয়ে আমার থেকে বেশি খবর অরিত্র রেখেছে।
— “সেই সময় তুই টলিউডে লেখা লেখির কাজের আশায় রোজ আশি কিলোমিটার যাতায়াত করতিস। বহুবার আমি নিজে ছেড়ে এসেছি তোকে! সকাল থেকে রাত—অডিশন, কাজের খোঁজ, অনিশ্চয়তা, ক্লান্তি… নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তখন তোর লড়াই শেষ হচ্ছিল না। বাইরে থেকে অনেকেই শুধু দেখত তুই দূরে সরে যাচ্ছিস।”
অরিত্র চুপ করে রইল। তারপর নিচু গলায় বলল,
— “তুই আমাদের গল্পে আর ছিলি না। কিন্তু সোহিনীর প্রতিটা দিনের ভেতর তুই ছিলি। তোর নাম উচ্চারণ না করেও ও তোকে মনে রাখত। কোথাও গেলে বলত, ‘নীর হলে এটা করত।’ কোনো গান শুনলে বলত, ‘ও এটা পছন্দ করত।’ আমি যতই চেষ্টা করি না কেন, মনে হতো আমি যেন একটা অসমাপ্ত গল্পের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছি।”
ও মাটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— “খুব কষ্ট হতো, নীর। প্রেম নিয়ে আমার ছোট ছোট যত স্বপ্ন ছিল—একসঙ্গে চা খাওয়া, বৃষ্টিতে হাঁটা, রাত জেগে গল্প করা—সব ধীরে ধীরে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। কারণ প্রেমিকা হিসেবে আমি পেয়েছিলাম এমন একজন মানুষকে, যার হৃদয়ের একটা বড় অংশ এখনও অন্য কারও স্মৃতির কাছে বন্ধক পড়ে ছিল।”
আমি অবাক পুরো…. তবু অরিত্রর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
ওর এই কথাগুলো আমি আগে কোনোদিন শুনিনি।
আমরা তো সোহিনীর বিয়ের আগে পর্যন্ত একসঙ্গে কাজ করেছি। অথচ এত বছরের পরিচয়ে একবারও ও নিজের বুকের ভেতরের এই ভারটার কথা বলেনি।
অরিত্র আবার বলতে শুরু করল।
— “একসময় ভাবলাম, হয়তো আমি ভুল জায়গায় ভালোবাসা খুঁজছি। আজকাল অনেকেই সম্পর্ককে খুব সহজ সমীকরণে মাপতে শেখে। মনে হয়, কাছাকাছি থাকা মানেই ভালোবাসা, একই বিছানায় শোয়া মানেই সম্পর্কের গভীরতা। তাই ভাবলাম, হয়তো শারীরিক ঘনিষ্ঠতা আমাদের মধ্যেকার দূরত্বটা মুছে দেবে।”
ও একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “সোহিনীও রাজি হয়েছিল। হয়তো ও ভেবেছিল, শরীর দিয়ে যদি মনের দূরত্বটা ঘোচানো যায়। হয়তো ভেবেছিল, এই ঘনিষ্ঠতা তোর স্মৃতির ছায়াটাকে মুছে দিতে পারবে। আমরা প্রথমবার যেদিন একসাথে শুয়েছিলাম, সেদিনও বৃষ্টি পড়ছিল। কিন্তু সেই রাতটা… কোনো আনন্দ ছিল না নাতো ছিল কোনো উত্তেজনা । শুধু ছিল একটা অসহ্য চেষ্টা। ওর শরীর আমার শরীরের সাথে জড়িয়ে গিয়েছিল কেবল শারীরিক ভাবে, কিন্তু চোখ দুটো ছিল অন্য কোথাও। প্রতিবার ছোঁয়ায় আমি অনুভব করছিলাম, ও যেন তোকে খুঁজছে। তোর নামটা ওর ঠোঁটে না এলেও, প্রতিটা নিঃশ্বাসে সেই অভাবটা ফুটে উঠছিল।”
অরিত্রের গলায় কোনো অভিযোগ ছিল না,
— “ও আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদত। বলত, ‘অরি, তুই আমাকে ছেড়ে যাবি নাতো? সত্যি করে বল? আমার দিব্যি খা…’ আমি বলতাম, ‘হ্যাঁ।’ কিন্তু ওর চোখে সেই বিশ্বাসটা কখনো পুরোপুরি আসত না। শারীরিক মিলনের পরেও আমার কামরসে ভেজা অবস্থাতেও ও একা হয়ে পাশে ফিরে সুয়ে যেতো। আমি ওকে জড়িয়ে রাখতাম, কিন্তু মনে হতো আমি যেন একটা ছায়া ধরে আছি। তোর ছায়া।”
অরিত্র চশমাটা খুলে চোখ মুছল।
— “তোরা যেমন উন্মাদের মতো একে অপরকে চাইতিস, আমাদের মধ্যে সেই আগুনটা কখনো জ্বললই না। ছিল শুধু একট ভাঙা আশ্রয়। ও তোকে ভুলতে চাইত, কিন্তু পারত না। আর আমি… আমি জানতাম, আমি শুধু পূরণ করছি একটা ফাঁকা জায়গা। একটা শূন্যস্থান.. তবু ছেড়ে দিতে পারিনি। কারণ ওর চোখে সেই একাকিত্ব দেখে আমার নিজের স্বপ্নগুলোও ভেঙে যাচ্ছিল বা হারিয়ে যাচ্ছিল।”
শোভন কে দেখলাম চিতার সামনে বসে। আগুনটা প্রায় নিভে এসেছে। শশান যাত্রীরা একে একে ফিরছে। কীর্তন দল খোল বাজাচ্ছে আর গান করে সোহিনীর জীবনের শেষমুহূর্ত কে বিদায় জানাচ্ছে।
আমি আর থামতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম “তাহলে শোভন? তাদের সম্পর্কটা? ও তো খুশি ছিল শোভনের সাথে? তাই না?”
অরিত্র উত্তর দিল না। অনেকক্ষণ শোভনের দিকে তাকিয়ে রইল। বাতাসে উড়ে যাওয়া ছাইগুলো ধীরে ধীরে আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছিল।
কাঠ ভেঙে পড়ার শব্দে চোখটা অন্যমনস্কভাবে সেই অগ্নিশিখার দিকে চলে গেল।
তারপর মৃদু হেসে অরি কাঁধে হাত রেখে বলল
“থাক না… ওসব জিজ্ঞেস না করলেই ভালো……..।।।”
১৮/৭/২৬
(পুরো গল্পটি পড়ে থাকলে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন! ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন।”